আলোচিত বিউটি হত্যাঃ মূল পরিকল্পনাকারী বাবা

0
352
সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করছেন পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা

হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

হবিগঞ্জের শায়েস্তগঞ্জের চাঞ্চল্যকর বিউটি হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।

শনিবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা। এসময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি উদ্ধার হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা জানান, বাবা ছায়েদ আলী নিজেই বিউটিকে নানার বাড়ি থেকে নিয়ে এসে তুলে দেন খুনিদের হাতে। আর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ময়না মিয়া বিউটির হত্যাকারী।

পুলিশ সুপার বলেন, গ্রাম্য রাজনীতির বলি হয়েছেন বিউটি। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রংপুরে আইনজীবী হত্যাকাণ্ডের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাস মার্চে বিউটিকে হত্যা নিয়ে যে পোস্টটি সারাদেশে ভাইরাল হয়, তদন্তে তার বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে।

বিধান ত্রিপুরা জানান, কিশোরী বিউটি হত্যা মামলার বাদী ও বিউটির বাবা ছায়েদ আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত হবিগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের আদালতে ছায়েদ আলী জবানবন্দি দেন। পরে ময়না মিয়ার স্ত্রী আছমা আক্তারের বক্তব্য রেকর্ড করেন আদালত।

তিনি বলেন, প্রথম দফায় ধর্ষণ মামলার সাক্ষী ময়না মিয়াকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে নতুন তথ্য। শেষ পর্যন্ত ময়না মিয়া শুক্রবার বিকেলে থেকে রাত পর্যন্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। প্রকাশ করেন জড়িত অন্যান্যদের নাম।

হত্যার ঘটনায় বিউটির নানী ফাতেমা বেগম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপর শুক্রবার রাতে একই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন গ্রেফতার বাবুল মিয়া। তিনি প্রথম দফায় বিউটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

অপরদিকে, বাবুলের মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে দুইদিনের রিমান্ড শেষে শুক্রবার রাতে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিউটির মা হুসনে আরা ও বিউটির ভাই সাদেক মিয়া পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।

পুলিশ সুপার জানান, বাবুল মিয়া অলিপুরে প্রাণ কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসাবে কাজ করেন। এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ইতোপূর্বে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু এরপরও বিউটির সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন বাবুল। পরে অলিপুর এলাকায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত বিউটিকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস করেন বাবুল। খবর পেয়ে বিউটির মা হুসনা বেগম ও বাবা ছায়েদ আলী মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাবুল বিউটিকে বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় সালিশে সমাধান হয়নি। পরে গত ১৪ মার্চ বাবুলের বিরুদ্ধে অপহরণসহ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। মামলার সাক্ষী করা হয় ময়না মিয়াকে। এঘটনার পর বিউটিকে বাড়িতে না রেখে পাঠিয়ে দেয়া হয় নানীর বাড়িতে।

বিধান ত্রিপুরা জানান, আগে থেকেই বাবুলদের পরিপারের সঙ্গে ময়না মিয়ার দ্বন্দ্ব ছিল। এই সুযোগেছায়েদ আলীকে ময়না মিয়া বোঝান, বাবুল যদি বিউটিকে বিয়ে না করে তাহলে তাকে কেউ বিয়ে করবে না। অন্য সন্তানদেরও বিয়ে হবে না। এর চেয়ে বউটিকে হত্যা করে বাবুল মিয়া ও তার মা কলম চান বিবিকে ফাঁসানো যেতে পারে। এক পর্যায়ে ময়না মিয়ার ফাঁদে পা দেন ছায়েদ আলী।

পুলিশ সুপার বলেন,  ময়না মিয়া ১০ হাজার টাকায় একজন পেশাদার খুনিকে ভাড়া করেন এবং আড়াই হাজার টাকা অগ্রীম দেন। পরে গত ১৬ মার্চ ঘটনার রাতে ছায়েদ আলী, ময়না মিয়া ও ভাড়াটে সেই ব্যক্তি গুণিপুর গ্রামে গিয়ে বিউটিকে চেয়ারম্যানের কাছে নেয়ার কথা বলে নানীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন। এরপর লাখাই উপজেলার হরিণাকোন গ্রামে রাত ২টার দিকে তাকে হত্যা করা হয়। ভাড়াটে ব্যক্তি বিউটির হাত-পা বাঁধে এবং ময়না মিয়া ছুরি দিয়ে ৫টি আঘাত করেন। পরে রক্ত ধুয়ে লাশটি হাওরে ফেলে রাখা হয়। পরদিন ঘটনা শুনে নানী ফাতেমা বেগম বিউটির বাড়িতে এলে তাকে ভয় দেখিয়ে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করা হয়।

বিউটির বাবা ছায়েদ আলী ও ময়না মিয়া

পুলিশ সুপার জানান, মেয়ের মৃত্যুর পর একজন বাবার যে অনুভূতি থাকার কথা ছিল তা ছায়েদের চেহারায় ছিল না। তাদের আচরণ ছিল সন্দেহজনক। পরে নিশ্চিত হয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে ভাড়াটে খুনিকে ধরতে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাবুল মিয়া সরাসরি হত্যায় জড়িত না থাকলেও তার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। অবশ্যই তাকে প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে মামলার অভিযোগপত্রে রাখা হবে।

আদালতে নানী ফাতেমা বেগম তার জবানবন্দিতে বিউটিকে রাতে কে নিয়ে এসেছে, কি ভাবে নিয়ে এসেছে ও তাকে কি বলে নিয়ে এসেছে- এসব বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

উল্লেখ্য, গত ১৬ মার্চ রাতে লাখাই উপজেলার গুণিপুর গ্রামের নানী বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় বিউটি। পরদিন ১৭ মার্চ প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে শায়েস্তাগঞ্জের হাওরে তার লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ১৮ মার্চ বিউটির বাবা ছায়েদ আলী বাদি হয়ে বাবুল মিয়া ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে আসামি করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here