চট্টগ্রাম বন্দরে এই প্রথম এলো অত্যাধুনিক রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রিক্রেন

0
283

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

প্রতিষ্ঠার ১৩১ বছরের মধ্যে এবার ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ যন্ত্রপাতি আসছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এই অর্থবছরে ৬৩৫ কোটি টাকায় সর্বোচ্চ ৪৫টি যন্ত্রপাতি আনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রিক্রেন, রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রিক্রেন, স্ট্রাডল ক্যারিয়ার, কনটেইনার মুভার, লক হ্যান্ডলার, টেলি হ্যান্ডলার ও আরএমজির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ৮০ শতাংশ এরই মধ্যে বন্দরে এসে পৌঁছেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে আসবে ছয়টি কী গ্যান্ট্রিক্রেন, ছয়টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রিক্রেন ও তিনটি স্ট্রাডল ক্যারিয়ার।


ক্রয়ের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এসব যন্ত্রপাতি জাহাজীকরণের অপেক্ষায় রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব যন্ত্রপাতি বহরে যুক্ত হলে বন্দরের অপারেশনাল কাজে আসবে আমূল পরিবর্তন। কমবে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময়, সাশ্রয় হবে ব্যবসায়ীদের অর্থ।

বন্দর প্রতিষ্ঠার ১৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও এতদিন এর বহরে ছিল না রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রিক্রেন। এবারই প্রথম ২২ কোটি টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় এসব যন্ত্রপাতি কিনেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ৪ এপ্রিল এটি বন্দরের বহরে যুক্ত হয়। অত্যাধুনিক এ সরঞ্জাম দিয়ে ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার ওঠানো যাবে আইসিডিগামী রেলে। আবার এতদিন চারটি কী গ্যান্ট্রিক্রেন দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কাজ চললেও এবার বহরে একসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন আরও ছয়টি কী গ্যান্ট্রিক্রেন। আধুনিক এ সরঞ্জাম দিয়ে জাহাজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি ঘণ্টায় কনটেইনার নামানো যায় ১৫ থেকে ২০টি।

এ প্রসঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়ার পরও নানা জটিলতায় বন্দরে এতদিন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনা সম্ভব হয়নি। এবার বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াস ছিল নৌ মন্ত্রণালয়। তাদের সম্মতি নিয়ে এখন কিছু যন্ত্রপাতি উন্মুক্ত দরপত্রে এবং কিছু যন্ত্রপাতি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা হচ্ছে। এ অর্থবছরে কী গ্যান্ট্রিক্রেন, রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রিক্রেনসহ জরুরি বেশ কিছু যন্ত্রপাতি

কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। যেসব যন্ত্রপাতি আসা বাকি আছে, সেগুলোর সবই বন্দরে এসে পৌঁছবে মাস তিনেকের মধ্যে।’

একই প্রসঙ্গে বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) নজমুল হক বলেন, ‘এসব যন্ত্রপাতি বহরে যুক্ত হলে অপারেশনাল কাজেও গতি বাড়বে অনেক।’

যন্ত্রপাতির সংকট মেটাতে চট্টগ্রাম বন্দর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এনসিটি প্রকল্পের এক হাজার ১২০ কোটি টাকায় যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে। আরও তিন বছর আগে এসব যন্ত্রপাতি কেনার কথা ছিল। তবে নানা অনিয়মের অভিযোগে প্রক্রিয়া

পিছিয়ে পড়ে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এরপর বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তারা ক্রয়ের অনুমতি দেয়। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতেও যন্ত্রপাতি কেনার সম্মতি দেয় মন্ত্রণালয়। এর পর বন্দর কর্তৃপক্ষ কিছু যন্ত্রপাতি উন্মুক্ত দরপত্রে এবং কিছু সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার টেন্ডার আহ্বান করে।

এনসিটি প্রকল্পে থাকা যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে- ছয়টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রিক্রেন (আরটিজি), আটটি স্ট্রাডল ক্যারিয়ার, চারটি এম্পটি হ্যান্ডলার ফর্ক লিফট, পাঁচটি কনটেইনার মুভার, সিসিটি ইয়ার্ডের আইসিডি পয়েন্টের জন্য দুটি আরএমজি ও দুটি কী গ্যান্ট্রিক্রেন। একইভাবে কার্গো ওঠানামা করাতে বিভিন্ন ধারণক্ষমতার ৩১টি মোবাইল ক্রেন, আরও ৩৮টি ফর্ক লিফট ট্রাক, ১৪টি ট্রাক্টর, ১৮টি ট্রেইলর, চারটি লগ হ্যান্ডলার, চারটি পানির ভাউচার ও দুটি কনজারভেন্সি ট্রাক কেনার প্রক্রিয়ায়ও রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দরে গত এক দশকে আসা যন্ত্রপাতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরেই সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারী যন্ত্রপাতি এসেছে বন্দরে। এবার ৬৩৫ কোটি টাকায় কী গ্যান্ট্রিক্রেন, রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রিক্রেন, রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রিক্রেনসহ ৪৫টি ভারী যন্ত্রপাতি কিনেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছিল ১২৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ২৭টি যন্ত্রপাতি। অথচ কয়েক বছর আগে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বন্দরে কোনো যন্ত্রপাতিই কেনা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান ও চিটাগাং চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহাবুবুল আলম বলেন, ‘প্রতি বছর গড়ে ১৬ শতাংশ হারে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনারের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কার্গো পণ্যও বাড়ছে প্রায় একই হারে। ক্রমবর্ধমান এ বাণিজ্য সামাল দিতে হলে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির কোনো বিকল্প নেই। এগুলো বহরে যুক্ত হলে পণ্য খালাসের কার্যক্রমে গতি আসবে। খরচও কমবে।’

একই প্রসঙ্গে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘পণ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ একটি জাহাজকে প্রতিদিন বাড়তি খরচ গুনতে হয় কমপক্ষে ১০ হাজার ডলার বা আট লাখ টাকা। বাড়তি এ খরচ ব্যবসায়ীরা প্রকারান্তরে ভোক্তাদের কাছ থেকেই আদায় করে। নতুন যন্ত্রপাতিতে অপারেশনাল কাজে গতি এলে এর সুফল তাই ভোক্তারাই পাবেন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here