“ ছোট কাঁকড়া শুকিয়ে তৈরি করছে মাছের খাদ্য” “সাগরে ধরা পরছে বিরল প্রজাতির ফ্লাওয়ার কাঁকড়া”

0
703

মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া(পটুয়াখালী)থেকে।।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বঙ্গোপসাগরসহ উপকূলের নদ-নদীতে জেলেদের সুক্ষফাঁসের জালে ধরা পড়ছে বিরল বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কাঁকড়া। স্থানীয়রা এটিকে টাইগার কাঁকড়া বললেও এটি ফ্লাওয়ার কাঁকড়া, নীল মৃত কাঁকড়া বা স্যান্ড কাঁকড়া হিসেবে পরিচিত। যার বৈজ্ঞানিক নাম চড়ৎঃঁহঁং ঢ়বষধমরপঁং । এক/দেড় ইঞ্চি সাইজের হাজার হাজার কাঁকড়া জেলেদের জালে ধরা পড়ায় জেলেরা এগুলো বিক্রি করতে না পেরে পা দিয়ে পিসে শুকিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করছে। সাগর ও নদীতে হঠাৎ করে বিরল প্রজাতির এই কাঁকড়া ধরা পড়ায় এই প্রজাতির কাঁকড়া রক্ষা ও নিধন রোধে জরুরী উদ্যেগ নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন পরিবেশবিদরা। সরেজমিনে ঘুরে দেখাযায়, হালকা বাদামি রঙের এই কাঁকড়া উপরিভাগের শক্ত খোলস চিতা বাঘের মতো ডোরা কালো কাটা। খোলসের দুই পাশে নিজেদের রক্ষার জন্য এক ইঞ্চি সাইজের বড় দুটি হুল রয়েছে। মা কাঁকড়ার দেহ হালকা হলুদ বা হালকা বাদামি বর্নের এবং এর দেহ মোটামোটি গোলাকার এবং পুরুষ কাঁকড়ার দেহ উজ্জল নীলবর্ন এবং ছোট-ছোট সাদা দাগ বিশিষ্ট। কুয়াকাটায় ধৃত কাঁকড়াগুলো ব্লু-সুইমার কাঁকড়ার পুরুষ জাতের।

কলাপাড়া মৎস্যবিভাগ সূত্রে জানায়, বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়ার চাষ ও দেখা গেলেও ফ্লাওয়ার কাঁকড়া বা টাইগার কাঁকড়া দেখা গিয়েছিলো প্রায় অর্ধশত বছর আগে। এই জাতের কাঁকড়া ভারত মহাসাগর ও ভূ-মধ্যসাগরের উপকুলসহ আফ্রিকা, দক্ষিনপূর্ব এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, পারস্য সাগর উপকূলে দেখা গেলেও বাংলাদেশে এই জাতের কাঁকড়া এখন আর দেখা যায় না। তবে সুন্দরবনের কিছু এলাকায় এই মেীসুমে কিছু কাঁকড়া দেখা যায়। জানাযায়, এই টাইগার প্রজাতির কাঁকড়া সমুদ্রে ডিম ছাড়ার জন্য
উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। ডিমের লার্ভাগুলো সাগরের জোয়ারের তোড়ে উপকূলে চলে আসে। গভীর সমুদ্রে ডিম ছাড়ার কারনে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগপর্যন্ত ছোট কাঁকড়াগুলো উপকূলের কাছেই বিচরণ করে। এগুলো ১৮-২৪ মাসের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। এটি প্রাপ্তবয়স্ত হলে ৩৫০ গ্রাম-ছয়শ গ্রাম পর্যন্ত হয়। কলাপাড়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শতশত শ্রমিক এই কাঁকড়া
শুকানোর কাজ করছে। প্রতিদিন ৫/৭টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এরা কাঁকড়া শিকার করেছে।

প্রতিটি গ্রুপে প্রতিদিন অন্তত ২/৩ মন কাঁকড়া শিকার করে তা পিষে মেরে বালুচরে শুকাচ্ছে। কাঁকড়া শুকানোর কাজ করছে জেলে মো. সোহেল। তার নেতৃত্বে অন্তত ৩০ শ্রমিক এইগ্রুপে কাঁকড়া শুকাচ্ছে। তিনি জানালেন, সাগরের ২/৩ কিলোমিটারের মধ্যে খুটা জেলেদের জালে এই কাঁকড়া বেশি ধরা পড়ছে। জালে অন্য মাছের সাথে ছোট ছোট এই কাঁকড়া বেশি ধরা পড়ায় তা বাছাইয়ের কাজ করছে ১০/১৫ শ্রমিক। মাছ থেকে এই কাঁকড়া আলাদা করে মাছ বিক্রি করলেও এই কাঁকড়া বিক্রি না হওয়ায় তা পিষে শুকিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করছে। প্রতিমন শুকনো কাঁকড়ার গুড়া ১১’শ/১২’শ টাকায় স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হচ্ছে। কাঁকড়া বাছাইয়ের কাজে নিয়োজিত ষাটোর্ধ আকলিমা বেগম বলেন,“মোর বাহে জাইল্লা আছিলো। জামাই, পোলারা হগলডিই জাইল্লা। কিন্তু এ্যাতো বছরেও এই কাঁড়রা দেহি নাই। কাঁড়রাগুলা দ্যাখতে সুন্দার। মারতে মোন চায় না। কিন্তু এতো কাঁড়রা কি হরবে। হেইয়ার লাইগ্যা বাইচ্ছা হুগাইতাছি”।

জেলে ইব্রাহিম মিয়া বলেন,“ আগেও জালে অনেক কাঁড়রা ধরা পড়ছে। কোন কোন সময় চাইর/পাঁচ মনও কাঁড়রা পাইছি। এই এই কাঁড়রা জীবনেও দেহি নাই। এগুলা মনে হয় বিদেশী কাঁকড়া। চিতা বাঘের মতো কাঁড়রাগুলা। তাই তারা এগুলারে টাইগার কাঁড়রা নামে ডাকেন”। কুয়াকাটায় ভ্রমনে আসা পর্যটক সাইদুর রহমান,অঞ্জলী মন্ডল, অরিত্র দেবনাথ বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র নিয়ে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। কিন্তু শুধুমাত্র জীবিকার প্রয়োজনে যেহারে মাছ শিকারের নামে বিলুপ্তপ্রায় সামুদ্রিক প্রানী সুক্ষ ফাঁস ও নেট জাল দিয়ে নিধন হচ্ছে তা ভয়াবহ। কারন চিংড়ি পোনা ধরার নামে প্রতিদিন লাখ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা মেরে ফেলা হচ্ছে। আর এখন নিধন হচ্ছে বিলুপ্ত প্রজাতির এই ফ্লাওয়ার কাঁকড়া। এই কাঁকড়া তারা অষ্ট্রেলিয়া বিচে দেখেছেন। এগুলো নিধন বন্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, এখানে ধরাপড়া কাঁকড়া খুবই বিরল ও মূল্যবান প্রজাতির। বাংলাদেশে এই কাঁকড়া দেখা না গেলেও এগুলো ভূ-মধ্যসাগরের উপকুলসহ আফ্রিকা, দক্ষিনপূর্ব এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, পারস্য সাগর উপকূলের কিছু এলাকায় দেখা যায়। এই জাতের কাঁকড়া ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে খাবার হিসাবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এশিয়া ও পারস্য অঞ্চলেও এ কাঁকড়ার বেশ খাদ্য চাহিদা আছে। পুরুষ কাঁকড়ার চেয়ে মা কাঁকড়ার মূল্য বেশি। তবে এই কাঁকড়া ধরা বিষয়ে কোন আইন না থাকায় তারা কিছুই করতে পারছেন না। তবে সুক্ষ ফাঁস কিংবা কারেন্ট জাল দিয়ে যাতে এগুলো শিকার করতে না পারে তার জন্য তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here