ভারতীয় সিনেমায় নারীর অবস্থান

0
397

ইনফোবাংলা ২৪ ডেস্কঃ 

১৮২৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর ফ্রান্সের পারিতে প্রদর্শিত হয় লুই ও অগুস্তু লুমিয়ের–এর সিনেমাতোগ্রাফ। সেই থেকে শুরু হয় সিনেমার পথ চলা।

আজকের ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে বিষয়টিকে সামান্য মনে হলেও সেদিন কেউই প্রায় ভাবতে পারেনি যে, ওই সামান্য সূচনায় ব্যাপ্ত হবে বিশালতায়। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, নাটক, ইত্যাদি শিল্পমাধ্যমগুলির তুলনায় চলচ্চিত্র সবচেয়ে নবীন হয়েও এর ব্যাপক অভিঘাত, প্রভাব ও স্বীকৃতি আমাদের আশ্চর্য করে।

বিশ্ব সিনেমার শতবর্ষ উপলক্ষ্যে তাই যখন ইউনেস্কোর প্রধান ফেদেরিকো মাইয়র পারিতে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সমাবেশে (২নভেম্বর,১৯৯৩) বলেন, “Emerging as it does in painting, theatre, music, literature & photography, the art of the cinema, which was invented in 1895, is the custodian of the memory of the twentieth century”- তখন তা অত্যুক্তি বলে মনে হয় না ।

ইতিমধ্যে ২০১৩ সালে ভারতীয় সিনেমাও দেখতে দেখতে শতবর্ষে পদার্পণ করল। বহু চড়াই – উতরাইয়ের সাক্ষী ভারতীয় সিনেমা। আর ভারতীয় সিনেমার বলিষ্ঠ ইতিহাস নির্মাণে নারীদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। অভিনয়ের দিক থেকে হোক কিংবা নির্দেশনার ক্ষেত্রে; ভারতীয় নারীরা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য ছাপ রেখেছে।
নির্বাক ছায়াছবির যুগে নারীদের ভূমিকা ছিল সামান্যই। বলা ভালো আলংকারিক। দর্শক বা সমালোচকদের চোখে তাঁরা সেভাবে দাগ কাটতে ব্যর্থ হন। প্রথম সাহসী ও বলিষ্ঠ নায়িকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় ১৯৩৫ সালে, হোমি ওয়াদিয়া পরিচালিত ‘হান্টারওয়ালি’ নামক চলচ্চিত্রে। নানারকম চমকপ্রদ শারীরিক কৌশল তথা দুঃসাহসিক কার্যকলাপে নারীকে প্রথমবার সিনেমার পর্দায় আবিস্কার করে ভারতীয় দর্শক।

শাড়ির পরম্পরাগত আবদ্ধতাকে বর্জন করে, মাথায় টুপি ও চোখে কালো চশমা আঁটা নায়িকা ভারতীয় সিনেমায় যেন নারীর এক স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণ করল। হাতে চাবুক নিয়ে, ঘোড়ার পিঠে চড়ে, অশুভ শক্তির সাথে লড়াই করে, পুরুষ প্রধান তথা পুরুষ নির্ধারিত মূল্যবোধকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানালো ছবির নায়িকা। ‘হান্টারওয়ালি’ সেদিক থেকে দেখলে নিঃসন্দেহে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম মাইলফলক।

১৯৪০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মেহেবুবের ‘আউরাত’ ছায়াছবিটির কথাও আমাদের স্মরণ করে নিতে হয়। মেয়ের সম্মান বাঁচাতে মা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে নিজের গর্ভজাত সন্তানকে হত্যা করে। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে ইতিপূর্বে এই ধরনের ঘটনা ঘটেনি। অন্যায়কে নীরবে সমর্থন না করে, প্রতিবাদ জানিয়েছে ছবির নায়িকা। তাঁর প্রতিবাদ কোনও ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে নয়, বরং সমাজ ব্যবস্থার এক বিশেষ নিয়মের বিরুদ্ধে। এই অনিয়ম দিনের পর দিন মেনে নিয়েছে আমাদের দেশের মেয়েরা । কেউ কেউ শুধুই লড়াই করে গিয়েছে। ১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, নার্গিস অভিনীত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ মেহেবুবের ‘আউরাত’ – এরই যেন পুনর্নির্মাণ। ভারতীয় সুপারহিট সিনেমার তালিকায় ‘মাদার ইন্ডিয়া’ অবশ্যই এক স্মরণীয় নাম।

গুলজার পরিচালিত ‘মৌসম’ (১৯৭৫) ও বি আর চোপড়ার ‘ইন্সাফ কি তারাজু’ (১৯৮০) ছায়াছবি দুটির কথাও অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। নারী ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয় (বিশেষ করে আশির দশকে) ভারতীয় সিনেমায় পরিবেশন করার সাহস দেখিয়েছেন বহু পরিচালক। তবে তা কখনও মার্জিতভাবে, কখনওবা ব্যবসায়িক মুনাফার কথা মাথায় রেখে। বি আর চোপড়ার ‘ইন্সাফ কি তারাজু’ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, যেখানে ছবির নায়িকা সাধারণ নারী থেকে এক খুনি নারী চরিত্রে রূপান্তরিত হল। নারীমূর্তির এই ভয়ঙ্কর রূপকে অনেক সিনেমা বিশেষজ্ঞই মা-কালীর রূপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এন চন্দ্রা পরিচালিত ‘প্রতিঘাত’ (১৯৮৬), রাজন কোঠারির ‘পুরুষ’ (১৯৯২), রাজকুমার সন্তোষীর ‘দামিনী’ (১৯৯৩), প্রভৃতি বহু সিনেমা- এই একই বিষয়ে নির্মিত হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, শুধুমাত্র আর্থিক মুনাফা লাভের উদ্দেশেই প্রযোজক-পরিচালকরা এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন। তাঁদের কাছে ‘ধর্ষণ’ লাভজনক একটি বিষয় মাত্র। একজন সাধারণ নারীর মধ্যে যে অজ্ঞাত শক্তি আছে, যে শক্তি সম্পর্কে সে নিজেও সঠিক অবগত নয়, সেই শক্তির প্রকাশের উপর অনেক কম পরিচালকই মার্জিতভাবে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছেন।

১৯৯৪ সাল শুধু ভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রে নয়, বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বি বি সি চ্যানেল ফোর – এর কমিশনে, দিল্লির ববি বেদির প্রযোজনায় এবং মুম্বাই – এর শেখর কাপুরের পরিচালনায় তৈরি হল সাড়াজাগানো সুপারহিট সিনেমা ‘দি ব্যান্ডিট কুইন’। ফুলন দেবীর জীবন কাহিনী অবলম্বনে তৈরি হয় এই ছায়াছবিটি। বাস্তব চরিত্রের চিত্রায়নে ‘দি ব্যান্ডিট কুইন’ একটি জলজ্যান্ত ভারতীয় নারীর রাগ, হিংস্রতার চরম প্রকাশ। অ্যাকশন, অত্যাচার, আর প্রতিহিংসার এক অবিশ্বাস্য বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুললেন পরিচালক শেখর কাপুর। আসলে ফুলন দেবীর অসহায়তার সাথে তাঁর শক্তির সেই অরথে কোনও সম্পর্কই নেই। নারী যেন সর্বদায় ভোগ্য বস্তু। ফুলন ধর্ষিত হচ্ছে বারবার। কখনও গরীব বলে, কখনও কুৎসিত বলে, কখনও ডাকাত হওয়ার ধৃষ্টতায়, কখনও শুধুমাত্র নারী পরিচিতির জন্য। পরিচালক শেখর কাপুর এক জোরালো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করালেন আমাদের – বাস্তব জীবনের নারী কতটা অসহায় ? সিনেমার নারী চরিত্রের চেয়েও কি অসহায় ?

খুব সম্প্রতিকালে পরিচালক মধুর ভাণ্ডারকার –এর নির্দেশনায় ‘চাঁদনী বার’, ‘পেজ থ্রি’, ‘ফ্যাশন’, কিংবা ‘হিরোইন’ প্রভৃতি ছায়াছবিতেও নারী চরিত্রকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা হয়েছে। এবং এক্ষেত্রে যে পরিচালক অনেকটাই সফল তা বলাই বাহুল্য। পরিচালক সুজয় ঘোষের ‘কাহানি’ সিনেমাটিও আমাদের অনেককেই আকর্ষিত করেছে কাহিনীর বুনোট, শিল্পীদের অসাধারন অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে। একজন সাধারণ মেয়ের দৃঢ় সংকল্পের গল্প ‘কাহানি’। স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সে এক শহর থেকে অন্য শহরে আসে। ভালো মানুষের সাহায্য যেমন সে পেয়েছে, তেমনি দেখেছে মানুষ প্রয়োজনে কতটা নীচে নামতে পারে। তবে অপরাধীদের শাস্তি দিতে তাঁর কখনই হাত কাঁপেনি। এই ছবির নায়িকা (বিদ্যা বালান) যখন অপরাধীর বুকে ছুরি বসান, তখন সেই দৃশ্য দেখে আমাদের দেবী দুর্গার অসুর বধের দৃশ্যটি মনে পড়ে যায়। পরিচালক সুজয় ঘোষ খুব সচেতনভাবেই এই সিনেমায় নায়িকা চরিত্রটিকে আত্মশক্তির উৎসকেন্দ্র রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। নির্মাণ করেছেন স্ত্রীলিঙ্গের শক্তির রূপ।

সাম্প্রতিক কালের বাংলা সিনেমাতেও দেখা গেছে অনেক পরিবর্তন। নিত্য নতুন বিষয় নিয়ে বহু উল্লেখযোগ্য সিনেমা নির্মিত হচ্ছে যেখানে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋতুপর্ণ ঘোষ, সুমন মুখোপাধ্যায়, অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়, মৈনাক ভৌমিক, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায়, প্রমুখ পরিচালকদের হাত ধরে এই প্রচেষ্টা অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়েছে। ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমাগুলির প্যাটার্নটা অন্যদের থেকে অনেকটা আলাদা। সম্পর্ক ভিত্তিক ছবি নির্মানের ক্ষেত্রে তিনি অনেকবেশি যত্নশীল । অনেক সাহসীও । ‘উনিশে এপ্রিল’ থেকে এই যাত্রা শুরু। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তিতলি’ অনেকটা আলো-আঁধারি খেলা। ‘চোখের বালি’তে ঋতুপর্ণ আরেকটু সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কের জটিলতায় যৌনতার প্রসঙ্গটিকে সতর্কভাবে এড়িয়ে গেলেও ঋতুপর্ণ সেই দিকটি বড়পর্দায় উপস্থাপন করলেন । এরপর ২০০৪ সালে তিনি বানালেন ‘রেইনকোট’ । সম্পর্কের গল্প। ২০০৫ সালে ঋতুপর্ণ ১৯ শতকের রক্ষণশীল বঙ্গ সমাজের কাহিনী অবলম্বনে বানালেন ‘অন্তরমহল’ । আবার দানা বাঁধল বিতর্ক । সামন্ত্রতন্ত্রের অন্দরে নারীনিগ্রহ, যৌন অত্যাচার, নারীত্বের চরম অপমানের কাহিনী। আর আছে সেইসব অপমানিতা অত্যাচারিতার মনের গহন আঁধারের কথা। আমাদের দেশে মহিলারা এখনও প্রকাশ্যে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতে অভ্যস্ত নন। সেইদিক থেকে দেখলে ঋতুপর্ণ এই ছায়াছবিতে হয়তো যৌনতা প্রসঙ্গে আধুনিক হতে চেয়েছিলেন। এরপর ২০০৭ সালে তিনি বানালেন ‘দোসর’। এই ছায়াছবিটিতে নেই যৌনতার বাড়াবাড়ি । আছে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে নারী মনের প্রশ্ন, দ্বিধা, ও বাস্তবতা ।

পরিচালক অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘চারুলতা ২০১১’ সিনেমাটিতে নায়িকা চরিত্রটিকে নির্মাণ করেছেন একুশ শতকের ব্যস্ত নগর জীবনের প্রতিনিধি চরিত্ররূপে । নগরজীবনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি নারীর মননকেও বদলে দিয়েছে । উচ্চ শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনও কিছুই কাজ নেই। টেলিভিশন দেখা, সিনেমা দেখা, দামি দামি শাড়ী কেনা, এইসব কাজের মধ্যেই তাঁর জীবনের সীমাবদ্ধতা । এই নারী যেন ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বকেই হারিয়ে ফেলে ।
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত ‘মুক্তধারা’ (২০১২) সিনেমাটিতে নারীর প্রেরনার শক্তিটিকে আমরা খুব সুন্দরভাবে খুঁজে পায় । নিজের বিবাহিত জীবন নিয়ে অসুখী নায়িকা । তাঁর প্রতিবন্ধী শিশু কন্যাটিকে নিয়েই সে ব্যস্ত । কিন্তু হঠাৎই তাঁর জীবনে আসে পরিবর্তন । তাঁর কাছে সুযোগ আসে সংশোধনাগারের বন্দী কয়েদীদের নিয়ে বাল্মীকি প্রতিভা পরিবেশন করার । পরিবর্তন ঘটে কয়েদীদের মানসিকতাতেও । সাহসী, দৃঢ়চেতা, প্রেরনাদাত্রী নারীর রূপকে পরিচালক ব্যবহার করেছেন অসামান্য দক্ষতায় ।
এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘দি জাপানিজ ওয়াইফ’ (২০১০), ‘ইতি মৃণালিনী’ (২০১১),  সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘চতুরঙ্গ’, ‘মহানগর @ কলকাতা’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত   ‘আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা’, মৈনাক ভৌমিক পরিচালিত ‘বেডরুম’, প্রভৃতি সিনেমায় আমরা স্ত্রী লিঙ্গের নির্মাণ দেখি ভিন্ন ভিন্ন রূপে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, এখনও ভারতীয় দর্শক, বিশেষত বাঙালিরা নগ্ন সত্যকে চাক্ষুষ করতে লজ্জা পায়। এই লজ্জা পাওয়াটা একটা সংস্কার। কিন্তু এই সংস্কারের মুক্তি ঘটতে এখনও অনেক দেরি। ভারতীয় দর্শকরা ঐতিহ্য ও রক্ষণশীলতার গণ্ডি এখনও সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে যাননি। একশ্রেণীর মানুষ তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে কুরুচিকর কাজ দীর্ঘদিন ধরে করে যাচ্ছেন। নারী তাঁদের কাছে ভোগ্য পণ্য মাত্র। অপরদিকে কিছু রুচিশীল শিল্পী দিনের পর দিন গবেষণা ও পরিশ্রম করে নারীর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। সিনেমার পর্দায় তাঁদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কাহিনি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে । তাঁদের এগিয়ে চলার সাহস জোগাচ্ছে। সময় এসেছে সেইসব শিল্পীদের প্রতিভাকে কুর্নিশ জানানোর আর দুষ্ট কুচক্রী মানুষের হাতে নির্মিত সিনেমাকে ছুঁড়ে ফেলার। ভারতীয় সিনেমার শতবর্ষ পরে তাই নতুন করে শাপমুক্তি ঘটুক নারীদের। সঠিক পথে এগিয়ে যাক ভারতীয় সিনেমা।

ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here